ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ডাক্তার কি বলেন?

ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু জ্বর কি?

ডেঙ্গু জ্বর হল একটি মশা-বাহিত ভাইরাস-ঘটিত রোগ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। ভারতবর্ষে প্রধানত প্রাক-গ্রীষ্ম এবং বর্ষা সময় এই রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। ডেঙ্গু সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি থাকে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত যায়। এপ্রিল মাসে এই হাড় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। জুন-জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাধারণত হ্রাস পেতে দেখা যায়। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। জুলাই মাসের শেষের দিকে এসে ও দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা। রাজধানী ঢাকার কিছু এলাকায় এসিড মশাবাহিত এ ভাইরাসটির সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এমন কিছু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে যা ডেঙ্গুর প্রথাগত উপসর্গ নয়। ডেঙ্গু হয়েছে কিনা সেটি বুঝতে না পারার কারণে হাসপাতালে যেতে দেরি করছেন রোগীরা। ফলে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসলেও অনেকেই মারা যাচ্ছেন।দেশে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা ৪৪ হাজার ছাড়িয়েছে। বছরের প্রথম সাত মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর এই সংখ্যা দেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ।এর আগে ২০১৯ সালে পুরো বছরে ১ লাখ ১ হাজার এবং ২০২২ সালে ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৫০৩ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় মৃত্যু হয়েছে আরও ৪ জনের।
তাতে এ বছর ২২৯ জনের মৃত্যু হল ডেঙ্গুতে। এর আগে ২০২২ সালে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছিল এইডিস মশাবাহিত এ রোগে।ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ বছর যাদের মৃত্যু হয়েছে,তাদের প্রায় সবাই ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে ভুগছিলেন এবং শক সিনড্রোমে মারা গেছেন।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ:

বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে প্রথমবার ডেঙ্গু-তে আক্রান্ত রোগীর বিশেষ কোন উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা যায় না। শুধু অল্প কিছু ক্ষেত্রেই রোগের প্রভাব গভীর হয়। ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গ গুলি হলো –

-উচ্চ মাত্রায় জ্বর
-তীব্র মাথার যন্ত্রণা
-চোখের পিছনে ব্যথার অনুভূতি
-মাংসপেশি এবং অস্থি সন্ধি তে ব্যাথা
-বমিভাব
-মাথাঘোরা
-গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
-ডায়রিয়া
-প্রচন্ড পেট ব্যাথা।
-ত্বকে বিভিন্ন স্থানে ফুসকুড়ি
এই উপসর্গ গুলি রোগ সংক্রমণের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। সাধারণত ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত উপসর্গ স্থায়ী হতে পারে। দ্বিতীয় বার ডেঙ্গু তে আক্রান্ত হলে রোগের ভয়াভয়তা বৃদ্ধি পায়। সেই কারনে পূর্বে ডেঙ্গু তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্কতা মেনে চলা উচিৎ ।

ডেঙ্গুর জীবাণু মানুষের শরীরের রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে রক্তনালীতে ছিদ্র তৈরি হয়। রক্ত প্রবাহে ক্লট-তৈরির কোষগুলির (প্ল্যাটলেট) সংখ্যা কমে যেতে থাকে। এর জন্য মানুষের শরীরে শক লাগা, শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তপাত, যে কোন অঙ্গের ক্ষতি এবং শেষ পর্যন্ত রোগীর মৃত্যু হতে পারে। রোগীর শরীরে গুরুতর উপসর্গ গুলির কোন একটি দেখা দিলে অতি অবশ্যই দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত বা রোগী কে নিকটবর্তী হসপিটালে ভর্তি করানো দরকার। অন্যথায় রোগীর প্রাণসংকট হতে পারে।

ডেঙ্গুতে প্লেটলেটের সংখ্যা সাধারণত কত হয়?

স্বাভাবিক স্বাস্থ্য সম্পন্ন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষের প্লেটলেট সংখ্যা হয় ১৫০০০০থেকে ৪৫০০০০ প্লেটলেট প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীদের এই সংখ্যা ২০০০০ এর নিচে চলে যেতে পারে। এই সময় রক্তপাতের ঝুঁকি সর্বোচ্চ হয়। মাঝারি ঝুঁকি পূর্ণ রোগীদের প্লেটলেট সংখ্যা ২১-৪০০০০/cumm মধ্যে থাকে। অবশ্য ডেঙ্গু সংক্রমণে অনেক ক্ষেত্রেই প্লেটলেট সংখ্যার দ্রুত পরিবর্তন হয়। প্লেটলেট কাউন্ট কম এবং রক্তক্ষরণের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তবেই প্লেটলেট প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। অন্যথায় সংক্রমণ কমার সাথে সাথে আমাদের শরীরে স্বাভাবিক ভাবে প্লেটলেট কাউন্ট বৃদ্ধি পায়। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ফোলেট এবং পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহন।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসাঃ

ডেঙ্গুর চিকিৎসার বিশেষ কোন ওষুধ বা প্রতিষেধক এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। গবেষকরা কাজ করে যাচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘরোয়া চিকিৎসাতেই কমে যায়। চিকিৎসকরা পেরাসিটামিল জাতীয় ওষুধ দিয়ে যন্ত্রণা এবং জ্বরের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেন। নন স্টেরেওডাল প্রদাহ-প্রতিরোধী ওষুধের রক্ত ক্ষরণের সম্ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অতিরিক্ত মাংসপেশি ব্যাথায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কার্যকারী ভূমিকা পালন করে।রোগের মাত্রা অতিরিক্ত ভাবে বৃদ্ধি পেলে রোগী কে হসপিটালে ভর্তি এবং ডাক্তারি নজরদারি তে রাখা একান্ত জরুরী।

ডেঙ্গু জ্বরের রোগীদের জন্য ডায়েটঃ

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের জন্য, কিছু পুষ্টি উপাদান বিশেষ ভাবে উপকারী হতে পারে, যেমন
ভিটামিন সি (সাইট্রাস ফল, বেরি এবং শাক-সবজিতে পাওয়া যায়), জিঙ্ক (সামুদ্রিক খাবার, মটরশুটি এবং বাদামে পাওয়া যায়), আয়রন (মাংস, মটরশুঁটিতে পাওয়া যায়),ওটমিল (সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট এবং ফাইবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ)
পেঁপে,নারিকেলের জল এবং সেই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে জল পান করা দরকার শরীর কে হাইড্রেট করার জন্য।
ডেঙ্গু হলে যেসব খাবার সহজে হজম হয়না এমন খাবার ডেঙ্গু রোগী দের খাওয়া উচিত নয়। যেমন – আমিষ খাবার, চর্বি,ও তৈলাক্ত খাবার।

ডেঙ্গু জ্বরের ঘরোয়া প্রতিকার:

ডেঙ্গু একটি মশা-বাহিত রোগ। তাই মশার কামড়ের হাত থেকে নিজেকে এবং আপনার পরিবার কে বাঁচান। বাড়ির চারপাশে জল জমতে দেবেন না। জমা জলে মশারা বংশবিস্তার করে। জল জমতে না দিয়ে মশার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সপ্তাহে অন্তত একবার জল জমতে পারে এমন জায়গা পর্যবেক্ষণ করুন। এবং গাছের টব, ফুলদানি, পরে থাকা গাড়ির টায়ারের জমে থাকা জল ফেলে দিন।
শরীর ঢাকা জামা কাপড় যেমন লম্বা-হাতা শার্ট, লম্বা প্যান্ট, মোজা এবং জুতা পরুন।
ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। এই সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকুন।
রাতে শোবার সময় মশারী ব্যবহার করুন।
মশা নিরোধক কেমিক্যাল যেমন পারমেথ্রিন ব্যবহার করুন।

অবশেষে বলতে চাই ডেঙ্গু জ্বর একটি সাধারণ রোগ। কিন্তু অবহেলা করলে এই রোগ মারাত্মক হতে পারে। শহরাঞ্চলে এর প্রকোপ বেশি। তাই নগরবাসীকে আরেকটু সজাগ ও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যাদের ডেঙ্গু হয়েছে তাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। দ্বিতীয় ডেঙ্গু সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং ভালো থাকুন। প্রয়োজনে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

  • ডাঃ তামজিদ হোসেন (পিটি)
    ফিজিওথেরাপি এবং রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ

One thought on “ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ডাক্তার কি বলেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *